খ্যাত ভালোবাসা
# খ্যাত ভালোবাসা #
আজকাল অধিকাংশ বিল্ডিং এ কার্নিশ নাই। অথচ সামনে বাড়িটায় কার্নিশ আছে। বৃষ্টির পানিগুলো কেমন ছন্দময় হয়ে কার্নিশ বেয়ে নামছে! ছাদের উপর দুটো পাখির হুটোপুটি। কাক ছাড়া এই শহরে অন্য পাখির দেখা মেলে না। অথচ কি অদ্ভূত ব্যাপার! এটা মাছরাঙা পাখি। লম্বা লেজের পথভোলা পাখিটা মনে হয় এই শহরে এসে পথ খুজে খুজে মরছে।
বারান্দায় দাড়িয়ে আকাশ ছাড়াও এগুলো দেখা যায়। সামনের বারান্দায় একটা ৩-৪ বছরের মাথাভর্তি চুলআলা বাচ্চা দাড়িয়ে আছে। নীচে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। হইহই শব্দে কখন মাস্ক মুখের নীচে নেমে গেছে! বারান্দার বাচ্চাটা হাত তালি দিচ্ছে আর খেলা দেখছে।
দরজার ওপাশে মা ডাকছে। খাবার নিয়েই দরজা বন্ধ করে দিলাম। কয়দিন খাবার খাওয়া,গল্পের বই পড়া আর বারান্দায় বসে থাকা ছাড়া কোন কাজ নেই। যখন অসহ্য লাগছে তখন মাস্ক পরে মা আর ছেলের সাথে দরজা ফাক করে একটু গল্প করে নিচ্ছি।
ছেলেটা আমার গায়ে পা না দিয়ে ঘুমাতেই পারেনা। নানুর কাছে কেমন করে ঘুমাচ্ছে কে জানে? একই বাড়িতে আমরা। অথচ বন্ধ দরজার এপাশ থেকে ছেলের ঘ্রাণ বুক ভরে নিতে পারছি না। ঘুমালে একটা অসহায় মায়া ফুটে ওঠে ছেলের ঠোটে আর চিবুকে। চিবুকটা নেড়ে কালো মুখের আলোটুকু ছুতে পারছিনা।
মা-আব্বার আর বোনদের উৎকন্ঠা ফোনেই টের পাচ্ছি। যদিও এমন দিনই সামনে অপেক্ষমান তবুও বুঝতে পারছি একাকিত্ব একটা বড় অসুখ।
আমাদের ছোটবেলার ফুলতোলা নকশীকাথাটা আজ দূরে সরে সরে যাচ্ছে। আমাদের চারবোনের একটা বড় পালংক ছিল। একটা বড় লেপ টানাটানি করতে করতে কখন যেন একসাথে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুম ভেঙ্গে সকালের আকাশ টা দেখে মন ভালো হয়ে যেত।
একবার আমি আর আমার পরের বোন (নীপা) ফ্যানদের একটা লিস্ট বানালাম। তখনকার সময় বারান্দায় দাড়িয়ে থেকে দেখতাম কোন ছেলেটা যেতে যেতে পিছন ফিরে ফিরে চায়। যে পিছন ফিরে তাকাবে সেই ই ফ্যান লিস্টে জায়গা করে নিবে। তখনও মোবাইল,ইমো,মেসেন্জারের ডিজিটাল যুগ আসেনি। কার চোখে কতটুকু অনুরাগ এটা জানা বা জানানো টা এতটা সহজ ছিল না। আর আব্বার হুঙ্কারের শব্দ সবার আগে কানে ভাসত। তাই দূর থেকে দেখা পর্যন্ত ছিল ই আমাদের সাহসের সীমান্ত।
মজার বিষয় হলো আমাদের ফ্যান লিস্টে কয়েকটা নাম কমন পড়ে গেল। দুজন আলাদা আলাদা করে লিস্ট টা বানালেও এই কমন পারসনদের নিয়ে মোটামুটি একটা ঝড় বয়ে গেল। দুজন দুজনার যুক্তি দিচ্ছি। একসময় দুজনই ফিক করে হেসে ফেললাম। আরে লোকের ছেলে নিয়ে আমাদের কেন ঝগড়া?
সেসব বায়বীয় মানুষগুলো কবেই ফ্যান লিস্ট থেকে হারিয়ে গেছে। আমাদের কৈশরের ফ্যান রা সীমাবদ্ধ ছিল রাস্তার সাইকেলে, পাড়ার আড্ডায় আর কবিতা লাইনে। "ভালোবাসি" এই শব্দটা নিষিদ্ধ ছিল আমাদের ডায়েরি তে। তাই বাস্তবে তাদের সাথে কোনদিন কথা বলা হয়ে ওঠেনি। বর্তমানের ডিজিটাল যুগে এসে মনে হয় আমরা আক্ষরিক অর্থেই খ্যাত অথবা এনালগ ছিলাম।
ভাগ্য ভালো খ্যাত ছিলাম।
তাই হয়ত ভালোবাসাটা নিত্য নতুন পোশাক পাল্টানোর মত ডাল-ভাত ব্যাপার ছিল না। ভালোবাসার অলৌকিক আবেগ আর কষ্ট জড়িয়ে সারাজীবন বাচতে শিখেছিলাম। তাই হয় প্রতিটা সম্পর্কের মূল্য আমাদের কাছে অসীম।
কাউকে শুধু স্বার্থ আর প্রয়োজনে ভালবাসতে শিখিনি বলেই কারো পাশে দাড়াতে কোন কারন খুজিনা। আর খুজিনা বলেই শত শত করোনা রোগী দেখে এসেও নিজের ভেতর আত্মতৃপ্তি টের পাই।
আমার প্রফেশনের অংশ হয়ত মানব সেবা। সেই সেবার জন্যেই একটা নির্মল,শুদ্ধ ভালোবাসা প্রয়োজন। আমাদের খ্যাত ছেলেবেলা শিখিয়েছে মানুষ কে বিনা কারনেই ভালোবাসতে হয়।
আজ করোনা রোগীর লাশ কবর দেয়ার লোক পাওয়া যায়না। সন্তান ফেলে যাচ্ছে বাবাকে। মা সন্তান কে রেখে আসছে বনে। স্বার্থপর সমাজ আশা করে আছে আমরা শুধু ওদের বুকে করে রাখব।
বুকে হয়ত রাখতে পারিনি। তবুও খ্যাত ভালোবাসা শিখিয়েছে মানুষের পাশে থাকাই সবচেয়ে বড় মানবিকতা।
তাই শ'খানেক অসহায় করোনা রোগী দেখে আইসোলেশনে থেকেও মনে হচ্ছে
আমি যেন ভালোবেসে আমার দায়িত্ব পালন করতে পারি।
হাসিমুখে যেন সেবা করতে পারি।
কারণ আমি বিশ্বাস করি
ভালোবাসার কখনো মৃত্যু হয়না। ভালোবাসা কখনো খ্যাত হয়না।
আল্লাহ্ পাক সহায় থাকলে বেচে থেকে ওদের পাশে থাকতে চাই।

No comments